দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি চট্টগ্রাম বন্দর

বিশ্বের শীর্ষ বন্দরের তালিকায় নিজের অবস্থান সৃষ্টি করেছে দেশীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর। গ্রে পোর্ট এখন পুরোপুরি কনটেইনার পোর্টে পরিণত হয়েছে এ বন্দর। ক্রমাগত ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বন্দর ২০২০ সালে অবকাঠামোগত উন্নত হয়েছে। এরমধ্যে কাজ শেষ হয়েছে নিরাপত্তা জোরদারে ৫১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কাজ।

এছাড়া কাজ চলছে পতেঙ্গা, পানগাঁও ও বে কনটেইনার টার্মিনাল এবং মাদারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের। করোনায় পৃথিবীর অনেক কিছু থমকে গেলেও এক দিনেরও জন্যও বন্ধ হয়নি চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম।

১৯৭৭ সালে ৬ টিইউ’স কনটেইনার পরিবহনের গ্রে পোর্ট এখন পুরোপুরি কনটেইনার পোর্টে পরিণত হয়েছে। পরবর্তীতে ৩১ বছর পরে ২০০৮ সালে বন্দরের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে ১০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। এ কর্মপরিধি ৭ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেল করে এবং পরবর্তী ৪ বছরে ২০১৯ সালে হ্যান্ডেলিং বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ লাখ কনটেইনার। এ ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে চট্টগ্রাম বন্দর পৃথিবীর সেরা ১০০ ব্যস্ততম বন্দরের তালিকায় চারবার স্থান পায়। তারমধ্যে ২০০৯ সাল ব্যতীত ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে টানা তিনবার ব্যস্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে থ্রি মিলিয়নার পোর্ট হিসেবে। এ তালিকাটি তৈরি করে ২৮৭ বছরের পুরানো জাহাজ ও এ সংক্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের বিশ্লেষণধর্মী পত্রিকা লয়েড লিস্ট।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, সারাবিশ্বে আতঙ্ক ও মহামারি সৃষ্টি করা নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা হলেও চট্টগ্রাম বন্দর একদিনের জন্যও বন্ধ ছিলো না। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর অর্জন করেছে চারটি সুসংবাদ। এ করোনা সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙরে শূন্য পাইরেসি অর্জিত হয়। একইভাবে ভারতের কলকাতা বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সাথে ট্রান্সশিপম্যান্ট পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়। এছাড়াও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল্যায়নে পরিকল্পনা কমিশন চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রমের প্রশংসা করে।

আরো জানা যায়, বন্দরে ৬টি প্রকল্প চলমান আছে। তারমধ্যে এ বছর শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও টার্মিনালের জন্য প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ প্রকল্প এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প। ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহের প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে ৯১৪ কোটি ৩৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে ৮ হাজার ৯৫৫ কোটি ৮১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহের প্রকল্পের শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২২ সালের জুনে এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৬ সালে ডিসেম্বরে।

তবে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ৩টি প্রকল্প। প্রকল্পগুলো হলো- পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, দুইটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন টাগ বোট সংগ্রহ ও কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা বৃদ্ধি করা। তবে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বন্দরের ১ নম্বর জেটির উজানে একটি সার্ভিস জেটি নির্মাণ প্রকল্প ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ হয়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘করোনার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম একদিনও বন্ধ ছিলো না। করোনার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক সহকর্মীর মৃত্যুও হয়েছে। তবুও আমরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সার্বক্ষণিকভাবে বন্দর কার্যক্রম চালু ছিলো। করোনায় জনবলের কারণে বিভিন্ন কার্যক্রমে ধীরগতি ছিলো। তবে আমরা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছি। ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে।’

এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বসানো হয়েছে ‘চিটাগাং পোর্ট সিসিটিভি কমান্ড অ্যান্ড কনট্রোল সেন্টার’। বন্দরের আনাচে-কানাচে বসানো হয়েছে ৫১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

এ সক্রিয় ক্যামেরা মনিটরিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কর্নেল আহমেদ জুনাইদ আলম খান জানান, ৫১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা ফাংশনাল রয়েছে। আরো তিন শতাধিক ক্যামেরা লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ ক্যামেরা মনিটরিংয়ের জন্য বড় একটি কন্ট্রোল রুম করা হয়েছে। এছাড়া এ বছরের মধ্যে ৭৪ হাজার ৭৭৯ জন ড্রাইভার, হেল্পার থেকে শুরু করে বিও, টিও স্টাফ, জেটি সরকার, সিএন্ডএফ এজেন্টসহ বন্দর ব্যবহারকারীদের ডাটাবেজ তৈরী করা হয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা জোরদার সাপেক্ষে ৯০ জন আনসার সদস্যের জন্য ব্যারাক নির্মাণ করার সুপারিশ প্রদান করে। এ প্রসঙ্গে বন্দর সচিব বলেন, ‘বন্দর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সবসময়ই আন্তরিক। বন্দর নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে ৫১৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এছাড়াও ডাটাবেজ তৈরি করে সিকিউরিটি ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। আর কাস্টম হাউজ আমাদের কাছে ব্যারাকের ব্যাপারে যে সুপারিশ করেছে, তা কোনো বড় বিষয় নয়। আনসার সদস্যদের জন্য প্রয়োজনে চট্টগ্রাম বন্দর একটি ব্যারাক তৈরি করে দিবো।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh