মরণোত্তর

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দু’জনের মধ্যে কে আগে মরবে, তা নিয়ে কথা উঠলে ফার্স্ট হওয়ার জন্য ছেলেমানুষি প্রতিযোগিতা হতো। বয়সের বিচারে স্বামীটি সাড়ে চার বছরের বড়। বার্ধক্যের কোঠায় ঢুকেছিল দু’জনেই। নিজেদের বুড়ো-বুড়ি পরিচয় দিত সগর্বে। যৌবনের রঙ্গ-রস যেটুকু অবশেষ ছিল, তা কেবল একান্তে নিজেদের জন্য। সংসারের সব দায়দায়িত্ব পালন আর ঝক্কি-ঝামেলা শেষ। স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিলিব্যবস্থাও হয়ে গেছে। ওপারে যাওয়ার জন্য এপারের কিনারে পা বাড়িয়ে বসে ছিল দু’জনই। স্ত্রীর লাফ দেওয়ার ইচ্ছেটা বেশি জোরালো। প্রায়ই গুডবাই বলার ভঙ্গিতে বলত, ‘একদিন ইনসুলিন নেওয়া বন্ধ করলেই কিডনি কি হার্ট ফেইল করবে আমার। হাসপাতালে নিও না কিন্তু! নিজের সংসারে থেকেই শেষ শ্বাস নিঃশ্বাসটা ফেলতে দিও।’ 

শেষ নিঃশ্বাস হরনের ক্ষমতা যে ওপরওয়ালার হাতে, তার কাছেও স্ত্রীর প্রার্থনার হাত উঠত নিয়মিত। রোগব্যধিতে শয্যাশায়ী থাকার বদলে হুট করে একদিন আজরাইলের রথে চড়ে পরলোকে যাত্রার প্রার্থনাও জানিয়েছে ঘনঘন। স্বামীকেও সরবে প্রায় শোনাত সে কথা। অন্যদিকে অনন্ত পরকালবাসের শান্তি নিশ্চিত করার বদলে ইহকালীন সুখ-সুবিধা ভোগের ব্যাপারে স্বামীটির ঝোঁক বেশি। তবে ওপরওয়ালার কাছে নির্ভেজাল চাওয়া ছিল এবং নিজের ক্ষমতারও সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেছে সে স্ত্রীকেই দীর্ঘায়ু করার জন্য। নিজের হৃদযন্ত্রে দুটি রিং পরানো ছাড়াও শরীর আরও একটি অপারেশনের ধকল সয়েছে। চারটি দাঁত পড়েছে। নকল দাঁতে একটার গর্ত ভরেনি আর। মাথায় শুধু নয়, সর্বাঙ্গেই সাদা নিশান উড়িয়ে দিয়েছে বার্ধক্য। স্ত্রীকে তাই সাহস জোগাত স্বামীটি, ‘ডায়াবেটিস নিয়েও তোমার বড় বোন এখনো হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। আমি মরার পর তুমি বোনের চেয়েও ভালো থাকবে অন্তত পনের-বিশ বছর। আমার পেনশনের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে পুরোটাই আমৃত্যু ভোগ করবে তুমি। এ আমার একান্ত ইচ্ছে। তা না হলে কিন্তু এ সরকারের কাছে মরেও বঞ্চনার শিকার হবো আমি। বুঝলে?’ 

গৃহবধূ হিসেবে সারাজীবন স্বামী-সংসারের সেবা করে এ যাবত মাসে নিয়মিত পাঁচ হাজার টাকাও হাত খরচা পায়নি বউটি। নানারকম খেঁচাখেঁচি ও সংসার খরচ এদিক-সেদিক করে নিজের প্রয়োজন মেটাতে হয়েছে। ভোগবিলাসী লোকটা নিজে ভোগের বদলে তার পেনশনের পুরোটাই স্ত্রীর ভোগে উৎসর্গ করতে চায়, এমন বিশ্বাস না জাগাই ছিল স্বাভাবিক। স্বামীকে তাই উল্টো উপদেশ দিয়েছিল, ‘আমি মরার পর দেখেশুনে গরিবের কমবয়সী একটি কাজের মেয়েকে বিয়ে কর। তা হলে তোমার পেনশনের পঁচিশ হাজার টাকা সেই মাগী আমার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভোগ করতে পারবে। তুমিও শেষ বয়সে রসকষ পাবে ভালোই।’

একদা দ্বিতীয় কিংবা স্ত্রীর বিকল্প নারীকে কাছে পাওয়ার কল্পনাও রোমাঞ্চ জাগাত; কিন্তু অন্য মেয়েমানুষের দিকে স্বামীর গোপন চাউনিতেও হবু-সতীনের ছায়া দেখলে হিংসায় জ্বলত স্ত্রীটি। দ্বিতীয় নারী, বিশেষ করে একটি কাজের মেয়ের সংসর্গ নিয়ে বয়সকালে দাম্পত্য বিবাদ এবং ভুল বোঝাবুঝির স্মৃতিও ভাণ্ডারে কম জমেনি; কিন্তু মৃত্যুর কিছুদিন আগেও স্বামীর পেনশনভোগ সম্পর্কিত স্ত্রীর দ্বিতীয় বিয়ের পরামর্শটি, সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর স্বামীর স্মৃতিতে দৈববাণীর মতো ঘুরিফেরে উদয় হতে থাকে।

স্ত্রীকে বরাবর মাথামোটা মানুষ মনে হতো লোকটির। নিজের ছাত্রীজীবনে যেমন, তেমনি দীর্ঘ সংসার ও দাম্পত্য জীবনেও ব্রেনওয়ার্ক তেমন করেনি সে। সেই মানুষ কিনা ব্রেনস্ট্রোকে, তাও ফার্স্ট স্ট্রোকেই স্বামীর আগে মরবে, কে ভেবেছিল? স্বজনরা কেউই এমন আশা করেনি। মৃত্যু যে কখনো সুন্দর জিনিস নয়, নিজের মরণে স্ত্রীটি দেখিয়ে দিয়ে গেছে। মুখখানা বাঁকা হয়ে পেত্নীর চেহারা পেয়েছিল, পরনের বস্ত্র নষ্ট হয়েছিল আপন বর্জ্যে। যথারীতি দাফন-কাফনের সময় পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে; কিন্তু বাঁকা মুখ সোজা হয়নি আর। 

গোরস্তান থেকে ফিরে আসার পর পুত্রবধূ স্বামী-শ্বশুরসহ সকলকে শুনিয়ে কান্নাভেজা গলায় সান্ত্বনা দেয়, ‘এমন স্ট্রোকের পরও মা প্যারালাইসড অবস্থায় বিছানায় থেকে কাউকে কষ্ট দেয়নি। মা বিছানায় পড়ে থাকলে বাবাই বেশি কষ্ট পেত। শেষ বয়সে রোগ-দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাকে এভাবে তুলে নিয়েছে। এটাও আল্লাহর অশেষ রহমত।’ 

স্ত্রীহারা হতে না হতেই ছেলের সংসারে ছেলে বউয়ের জিম্মায় নিজেকে অবাঞ্ছিত ও অসহায় মনে হয় লোকটির। স্ত্রী বেঁচে থাকতে এরকম মনে হয়নি। পুত্রবধূ যেন আগে মরার জন্য শাশুড়িকে আল্লাহর রহমত প্রাইজ দিচ্ছে। আর বেঁচে থাকার জন্য শ্বশুরকে সে কী দেবে, তা ভাবার আগে দৈববাণীর মতো মনে পড়ে স্ত্রীর শেষ উপদেশটি। নাম্বার ওয়ান সেলফিশ পুত্রবধূর চরিত্র জানত বলেই হবু-সতীনকেও সে মেনে নিয়েছিল; কিন্তু শেষ বয়সে নতুন বিয়ের ভাবনা আসার কষ্টেও সদ্য স্ত্রীহারা স্বামীর চোখ থেকে শোকের অশ্রু গড়ায়।

একা হওয়ার পর বড় ছেলের সংসারে আশ্রিত না হয়ে তার উপায়ও নেই। নির্ভরযোগ্য মেয়ে-জামাই বিদেশে। ছোট ছেলের ছোট চাকরি। শ্বশুরবাড়ির তত্ত্বাবধানে থাকে ভাড়াবাসায়। অন্যদিকে নিজের গ্রাচুইটি-প্রভিডেন্ড ফান্ডের পুরো টাকাটা সে বড় ছেলের এই ফ্ল্যাট কিনতে দিয়েছিল শেষ বয়সে বুড়ো-বুড়ি এখানেই থাকবে বলে। বলা যায় বাপের কেনা ফ্ল্যাটেই বাস করছে ছেলে। এ ব্যাপারে তার পিতৃনির্ভরতা ছোটবেলার মতোই দ্বিধাহীন; কিন্তু পুত্রবধূ শাশুড়ি বেঁচে থাকতে সখেদে প্রায়ই বলত, ‘দু’জনই চাকরি করি আমরা, তারপরও শাশুড়ির সংসারে আশ্রিত হয়ে আছি! নিজের ফ্ল্যাট-সংসার কোনোদিনই হবে না আমার।’ শাশুড়ির আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের অশ্রুর পেছনে তার নিজস্ব সংসার হওয়ার সুখটাও স্পষ্ট দেখতে পায় শ্বশুর। অনিচ্ছাতেও তার জামার ভেতরে ব্রার অবয়ব দেখতে পায় যেমন। ছেলে ও বউ দু’জনই অফিস করায় তাদের দুই সন্তান থাকত দাদু-দিদা ও কাজের মেয়েদের জিম্মায়। স্কুল-ক্লাস না থাকলে বাসায় দুই নাতি-নাতনির সঙ্গে প্রায় দিনেই যোগ দিতো তাদের প্রতিবেশী ও সমবয়সী কাজিন। নাতি-নাতনিদের খেলার দর্শক, সাথী, কখনোবা রেফারির ভূমিকায় পালন করতে হতো দাদুকেই; কিন্তু জ্বালাতনটা যে তাদের দিদার ওপর দিয়েই বেশি যেত, সেটা স্ত্রীর মৃত্যুর পর হাড়ে হাড়ে টের পেতে লাগল স্বামীটি। 

দিদার মৃত্যুশোক কাটতে না কাটতেই, তার অনুপস্থিতির শূন্যতাও যেন খেলার মাঠ হয়ে যায় নাতিদের কাছে। দিদা বেঁচে থাকতে শোবার ঘরে কিংবা কিচেনে ছোটাছুটি ও লুকোচুরি খেলতে পারত না ওরা। কাজিনদের নিয়ে এখন অবাধে নিষিদ্ধ জায়গাতেও দাপিয়ে বেড়াতে লাগল। দাদুর একাকীত্বের কষ্টকে লাথি মেরে নিজেদের খেলার আনন্দটাই বড় করে তোলে তারা। অবশ্য ঘরে একা চুপচাপ দেখে আট বছরের নাতনি সহানুভূতি দেখিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছে, ‘দিদাকে মিস করছ খুব? এক কাজ কর দাদু, ইউটিউবে ভিডিও-গেম দেখো, তাহলে মন ভালো হয়ে যাবে। দাও ফোনটা, আমি গ্রানি বের করে দিচ্ছি।’

ক্লাস ফাইভে পড়া বড় নাতিকে স্মার্টফোনের বদলে কম্পিউটার দেওয়া হয়েছে তার লেখাপড়ার সুবিধা হবে বলে। খেলার সাথীদের অভাবে একা থাকলে নাতি সেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে ইন্টারনেটের অসীম জগতেও খেলার আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। গুগল সার্চে যে কোনো প্রশ্নের জবাব খুঁজে জ্ঞানের গভীরতা দেখায় দাদুকে। ছোট বোনটি ভাইয়ের সঙ্গে পারে না বলে দাদুর ফোন নিয়ে টানাটানি করে বেশি। নাতি ও নাতনি দু’জনেই স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ চালাতে দাদুর চেয়েও পাকা। বড়টি বাবা-মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও নিজে ভুয়া-ছবি-নাম ব্যবহার করে ফেসবুকেও অ্যাকাউন্ট খুলেছে। কৈশোর না পেরুতেই সে গার্লফ্রেন্ড খোঁজে। ইন্টারনেটের অসীম দুনিয়ায় নিজের নিভৃত আনন্দ-ভ্রমণ নির্বিঘ্ন রাখতে দাদুকেও সে একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছে। দিদার মৃত্যুর পর দাদুকে সে সান্ত্বনা দেয়, ‘বেশি ইউটিউব দেখলে দিদা তো আগে আগে খ্যাঁচখ্যাঁচ করত। এখন সারাদিন ইউটিউব-ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জার করো। নতুন নতুন গার্লফ্রেন্ডদের ম্যাসেজ পাঠাও। কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।’

‘তার মানে দিদা মরে গিয়ে আমাদের সুবিধাই হয়েছে রুহু, তাই না?’

রুহু স্মার্টলি জবাব দেয়, ‘বুড়ো হয়ে গেলে মানুষ তো মরবেই। তুমিও তো মরবে। মা তো ঠিক কথাই বলে দাদু, বুড়ো মানুষের তাড়াতাড়ি মরে যাওয়াই ভালো। তা হলে কষ্ট কম হবে।’

এইটুকু ছেলের শোকদুঃখের আবেগহীন এমন নির্মোহ স্বাভাবিকতা দেখে দাদুর নিজের শোক উথলে ওঠে। সাধে কি স্ত্রী বলতো, মায়ের মতো স্বার্থপর হবে রুহুটা? বাসায় একদিন নাতিদের সঙ্গে খেলতে দেখে এক বন্ধু প্রশস্তি গেয়েছিল, ‘নাতি-নাতনি নিয়ে স্বর্গীয় বাগানে আছ মনে হচ্ছে। বেশ কাটছে সময়। তাই না?’

অস্বীকার করা যাবে না - স্ত্রী বেঁচে থাকতে স্বর্গীয় বাগানের ফেরেশতারা আনন্দের বড় উৎস হয়ে উঠত প্রায়ই; কিন্তু শিশুরা যে ইবলিশ শয়তানের চেয়েও ভয়ঙ্কর ও দুর্বিসহ যন্ত্রণার উৎস হতে পারে, তা বুড়ো দাদু একা হয়ে হাড়েমজ্জায় টের পেতে লাগল প্রায়ই। নতুন করে বুঝল একদিন নিজের মোবাইল ফোনটা উধাও হয়ে যাওয়ার পর। 

দাদুর মোবাইল নিয়ে নাতি-নাতনিরা খেলত বলে সন্দেহটা ওদের ওপর আসা স্বাভাবিক; কিন্তু দু’জনেই স্রেফ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করে, আমরা কি চোর-ডাকাত? নানাভাবে অনুরোধ ও প্রলোভন দেখানোর পর আপোসরফা হয়। দাদু নামাজ পড়তে মসজিদে কিংবা হাঁটতে বাইরে যাক, ওরা ফোনটা যাদুবলে খুঁজে বের করবে।

দাদুকে বাইরে পাঠিয়ে পিচ্চিদের কোনো স্বার্থ হাসিলের মতলবের কাছে নতি স্বীকার করে দাদুটি বাইরে যায়। নির্জন ঘরের একাকিত্ব কিংবা নাতি-নাতনিদের উৎপাত থেকে মুক্তির সহজ পথ পাঁচবার মহল্লার মসজিদে যাওয়া; কিন্তু আল্লাহর পথে শ্বশুরের আগ্রহ কম দেখে, তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য নিজের মরহুম পিতার গল্প শোনায় পুত্রবধূ। অবসর নেওয়ার পর নাকি পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়া ছাড়াও, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দশ ঘণ্টা আল্লার ধ্যানেই কাটত তার। হাতে তসবি থাকত ঘুমের মধ্যেও। এমন ধার্মিক পিতার মেয়ে হয়ে নিজে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়েও শ্বশুরকে মসজিদে পাঠানোর উপদেশটা ভালো লাগে না তার। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ঠিক না। মরার পর আমার কবরে যা ঘটবে, তার ভাগ নিতে যাবে কেউ তোমরা?

বউমার সঙ্গে কথা বলারও রুচি হয় না বলে নিজের চিন্তাচেতনা চেপে রাখে সে। আর নাতি ও তাদের তার গৃহবন্দি সময়টাকে দুর্বিষহ করে তুললে অপ্রয়োজনেও নগরীর রাস্তায় কিংবা পার্কে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে ভালো লাগে। ফ্ল্যাটটা কেনার সময় সকাল বিকাল হাঁটার জন্য কাছাকাছি চন্দ্রিমা উদ্যানের অবস্থানটি প্লাস পয়েন্ট মনে হয়েছিল। সেখানে নিয়মিত হাঁটার সঙ্গীও জুটেছে বেশ কয়েকজন। আর ভাগ্যগুণে সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়েছে নির্ভরযোগ্য পুরনো বন্ধু তপংকর চক্রবর্তী ওরফে তপু। 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বিভেদ ঘুচিয়ে যেমন মুক্তিকামী বাঙালি একাত্ম ও মানবিকতার মহান বোধে উদ্দীপ্ত মানুষ হয়েছিল, তপুর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তারও আগে থেকে, বলা যায় মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় ও খেলার আনন্দে গড়ে উঠেছিল সেই কৈশোরে। একাত্তরে দু’জন একই সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল ইন্ডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য। তারপর কলেজজীবন থেকে কর্মজীবনের শুরু এবং পরস্পরের বিবাহেও শরিক হওয়া পর্যন্ত বন্ধুত্বের সম্পর্কটা নিবিড়ই ছিল; কিন্তু চাকরি ও সংসারজীবনের আত্মমগ্নতা দু’জনের মধ্যে ক্রমে দূরত্ব এতটাই বাড়িয়ে তুলেছিল যে, টেলিফোনে যোগাযোগও ছিল না দীর্ঘ কয়েক বছর। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তপু আমেরিকান-নাগরিক ছেলের বাড়িতে সস্ত্রীক আশ্রয় নিয়েছিল। বছর চারেক ছিল সেখানে। ছেলের সুবাদে আমেরিকায় বসবাসের গ্রিনকার্ড পেয়েছে, এতদিনে নাগরিকত্বও পেয়ে যাওয়ার কথা; কিন্তু সনাতন ধর্মে আস্থাশীল তপংকর চক্রবর্তীর স্ত্রী শেষ পর্যন্ত আমেরিকার জীবনধারা মানিয়ে নিতে পারেনি। দেশের মাটিতেই পুড়ে ছাই হবার বাসনা নিয়ে দেশে ফিরেছে। ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। সেই বড় ফ্ল্যাটে সপরিবার ছোট মেয়েকেও রেখেছে। আমেরিকান ছেলের সুবাদে দেশেও তপংকরের প্রতিষ্ঠা পোক্ত। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ঘাটতি নেই কোনো। 

দু’বন্ধুতে আবার যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আসাটা দু’জনের জন্যই শেষ বয়সের বড় আশীর্বাদ। নিজেরা তারা স্বীকার করে, আর দুই বন্ধুর তুই-তোকারি সম্পর্ক দেখে অন্যরাও সেটা বুঝতে পারে। বাসাতেও নানা উপলক্ষে সস্ত্রীক যাতায়াত ছিল উভয়ের। বন্ধু বিপত্নীক হওয়ার পর তপুর বন্ধুপ্রীতি ও দায়টাও যেন বেড়েছে। শরীর খারাপের জন্য যেদিন পার্কে বা রাস্তায় হাঁটার সঙ্গী হতে পারে না, ফোনে নিয়মিত খোঁজ নেয়। নাতিদের কাছে ফোন নিয়ে জব্দ হওয়ার খবর শুনে তপু নতুন লকসিস্টেম ফোন কিনে তা গোপনে ব্যবহারের কৌশলও শিখিয়ে দেয়।

পার্কে দু’জনের মনখোলা একান্ত আলাপে তপুই একদিন বন্ধুকে জোরালো মত দেয়, ‘আমার মনে হয়, মৃত্যুর আগে ভাবি তোকে ঠিক পরামর্শটাই দিয়ে গেছে। তোর সমস্যা যতটুকু বুঝছি, দেখেশুনে আরেকটা বিয়ে করাটাই সমাধান। তাতে তোর বর্তমান চাহিদা মিটবে, পেনশনের ভবিষ্যৎ সদ্ব্যবহারও নিশ্চিত হবে।

বন্ধু বলার আগেই সে দ্বিতীয় বিবাহটা কল্পনায় ঘটিয়ে তার সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বিস্তারিত উপভোগ করেছে। অভিজ্ঞ মানুষের মতো জবাব দেয়, ‘প্রথম কথা হলো, এই বয়সে দ্বিতীয় বিবাহ করলে আমার তিন ছেলেমেয়ের কেউই সহজভাবে মানবে না। নিজের পেনশন ও সঞ্চয়পাতির জোরে ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে নতুন বউকে নিয়ে আলাদা সংসার চলবে হয়তো, কিন্তু বউয়ের বয়স কম হলে তার শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটাতে পারব না।’

‘আরে বেটা সত্তর বছর এই যুগে কোনো বয়স না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তিন নং বউটারে দেখিস নাই? খালি কি লোক দেখানোর জন্য ফার্স্টলেডিরে হাত ধরে হাঁটে? নিয়মিত এক বিছানায় থাকে অফকোর্স। এই বয়সে আমি যদি নিজের বৃদ্ধাটির সঙ্গে মাসে অন্তত দু’বার থাকতে পারি, তুইও নতুন বউয়ের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার হেসে খেলে পারবি রে। আমি ড্যাম সিওর। উপযুক্ত ওষুধ তো তোকে দিয়েছি।’

স্ত্রীর মৃত্যুর মাসখানেক আগেও সে অনিচ্ছুক স্ত্রীর ওপর যৌবনের তেজ ও দৃঢ়তা দেখাতে পেরেছিল। তার মূলেও ছিল তপু চক্রবর্তীর দেওয়া দাওয়াই তথা ভায়াগ্রা। কথা প্রসঙ্গে একদিন তার উত্থানরহিত যৌনসমস্যার কথা জানালে, সেদিনই দুশ’ টাকায় চারটা ট্যাবলেট কিনে বন্ধুকে দিয়েছিল। সেই ওষুধগুণেই হঠাৎ স্বামীর যৌবনের হারানো পরাক্রম দেখে স্ত্রী হয়তো দ্বিতীয় বিবাহের পরামর্শ দিয়ে গেছে; কিন্তু এসব ওষুধের গুণে সম্ভাব্য দ্বিতীয় স্ত্রীর চাহিদা আর কতদিন মেটাতে পারবে সে? তারচেয়েও বড় কথা এই বয়সে দ্বিতীয় বিয়ের পাত্রী খুঁজছে জানলে পেশাদার ঘটকও ভীমরতির সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে তার গল্প রসিয়ে রসিয়ে অন্যদের শোনাবে নিশ্চয়। 

তপুর দেওয়া সেক্স-হরমন বাড়ানো ট্যাবলেট খেয়ে যদি সে স্ত্রী সহবাস করে, তবে নবপরিণীতা তাকে ওই ওষুধ খাইয়েই মারবে হয়তো। আর ভায়েগ্রার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় না হোক, যে কোনো ছুতোয় আগামী পাঁচ-দশ বছরে মরতে হবে বলে সে মোটামুটি নিশ্চিত। দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে রেখে মরে গেলে প্রথম পক্ষের কোনো সন্তান এবং নাতি-নাতনিও শ্রদ্ধা কি শোক জানাতে আসবে না। মৃত্যুর পরও স্বজন-সমাজের ঘৃণাবোধ নিথর শরীরে পাহাড়ের মতো চাপ সৃষ্টি করবে। এরকম নিঃসঙ্গ ও ট্রাজিক মরণ মেনে নেওয়ার সাহস বা যুক্তি কোনোটাই খুঁজে পায় না সে।

তপুকে এসব যুক্তি দিলে সে তার স্বভাবসুলভ ঔদার্য দেখাতে লেকচার দেয়, ‘বাঙালি কোনোদিন মানুষ হবে নারে। তাদের কাছে পিতা মানে দেবতা, স্ত্রী মানে সতী-সাবিত্রি, ভাই মানে রাম-লক্ষণ। আর আসল জীবন মানে পরজন্ম কি অনন্ত পরকাল। এইসব ভুয়া আদর্শ-বিশ্বাস নিয়ে আমরা আছি এখনো! আসলে বয়স হলেও যে ব্যক্তির জীবনে কত চাহিদা থাকে- নিজের পরিবারের সন্তানরাও বুঝতে চায় না; কিন্তু তোদের ধর্মে তো একাধিক বিয়ের পারমিশন দেওয়াই আছে। তোদের নবীজিও বেশ কয়েকটা বিয়ে করেছিল না?’

‘যত যুক্তি দে, সন্তানরা মায়ের আসনে বিকল্প কাউকে দেখতে চায় না। যৌবনকাল যাওয়ার পরও বুড়ো বয়সে পিতার যৌনক্ষুধা তাদের কাছে বিকৃতি কিংবা চরিত্রহীনতা মনে হবে।’

‘আমার মেয়েটাও ওইরকম রে। আমি ঠিক করেছি বউটা মরে গেলে আমেরিকায় গিয়ে একা হবো। সিটিজেনশিপ হয়ে গেলে ওখানে ভাতা পাবো। তা দিয়ে ডেটিং করার মতো বুড়ি পাই তো ভালো, না হলে কোনো ওলডহোমে থেকে কুকুর পালব।’

‘তুই তো আমেরিকান সিটিজেন প্রায় হয়েই আছিস। আমি কি তবে ধর্মকর্মে মন দেব তপু?’

‘শেষ বয়সে ওসব ভণ্ডামি করে পার পাবি না। তোর যৌনক্ষমতা যখন ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, সঙ্গীনির ব্যবস্থাও হবে। তবে পেশাদার ঘটক দিয়ে কাজ হবে না। তোর জন্য উপযুক্ত একটা পাত্রী আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে। তুইও ফেসবুকে খুঁজে দেখ, আমিও দেখছি ইন্টারনেটে আর কীভাবে খোঁজা যায়।’

বন্ধু তপুর পরামর্শে এবং ইচরেপাকা নাতি রুহুর প্রভাবেও বটে, ফেসবুক-ইন্টারনেটে আসক্তি জন্মেছে লোকটির বৃদ্ধ বয়সেও। ছেলের সংসারে নিজের একাকীত্বের সময়টায় ফোনের স্ক্রিনে নানা খবর ও ছবি দেখে। মাঝে মাঝে নিজেও সামাজিক সমস্যায় স্ট্যাটাস দিয়ে প্রগতিশীল মতামত দেয়। স্ত্রীর মত্যৃর পর তার ছবিসহ ব্যক্তিগত শোকসংবাদটি ফেসবুকে জানালে মন্তব্যের ঘরে সহানুভূতি জানিয়েছে একচল্লিশ জন। যারা মন্তব্য করেনি, তারাও লাইক বাটনে চাপ দিয়ে আহা রে মার্কা সহানুভূতি জানিয়েছে; কিন্তু শতাধিক ফেবু বন্ধুর প্রতিক্রিয়া মন ভরিয়েছে তার কতটুকু? এতদিন দেখেশুনে যা বুঝেছে সে, তাতে ফেসবুকের হাজার চেনা-অচেনা বন্ধুদের ওপরেও বিন্দুমাত্র আস্থা নেই তার। থাকলে কি আর ঘুরেফিরে পুরনো বন্ধু তপুর সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা ফোনে কানে কানে কথা না হলে অস্থির হয়ে ওঠে? ফেসবুক কি ম্যাসেঞ্জারেও তপুর মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর খবর খোঁজে সে প্রথম।

দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছেটি চিন্তাচেতনায় শিকড় ছড়াবার আগেই, একদিন ফেসবুকে তপুর স্ট্যাটাসে নিজেকে অবিষ্কার করে চমকে ওঠে। তপু লিখেছে, তার অতি পরিচিত একজন সজ্জন মানুষ স্ত্রীর মৃত্যুতে বড় একা হয়ে পড়েছে। সত্তর বছর বয়সী এই পাত্রের জন্য মাসিক ত্রিশ হাজার টাকার সরকারি পেনশন ছাড়াও অন্যান্য সম্পদের বৈধ উত্তরাধিকারী হওয়ার শর্তে আগ্রহী মধ্যবয়সী বিধবা পাত্রী প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, পাত্র শারীরিকভাবে সচল ও সক্ষম, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। যোগ্য ও আগ্রহী পাত্রীর সন্ধান কারও জানা থাকলে ইনবক্স করুন।

ফেসবুকে নিজের সমস্যার বিজ্ঞাপন দেখে সে হঠাৎ বেআব্রু হয়ে যাওয়ার মতো লজ্জা-ভয়ে চারদিকে তাকায়। এগার বছরের নাতি তার ফেসবুক পড়তে পারে। নাতির বাবা-মায়েরাও ফেসবুক করে, কাজেই সংসারের একান্ত স্বজনদের কাছে ধরা পড়ার ভয়টাই চলকে ওঠে প্রথম। তপুকে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করে ধমক দেয়, ‘এটা কী করেছিস তুই হারামী, সর্বনাশ হবে আমার!’

তপু তার স্বভাবসিদ্ধ বরাভয় দেয়, ‘আরে দোস্ত, ফেসবুকে সব শালারা জন্মদিন, বিবাহ দিনসহ নিজেদের জীবনের তুচ্ছ ব্যাপার ছবিসহ প্রচার করে। আমি প্রবীণদের একটি মানবিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। তোর নাম-পরিচয় তো দেইনি। কেউ টের পাবে না। নানাভাবে তোর যোগ্য সঙ্গী খুঁজছি আমি, দেখা যাক।

মাত্র দু’দিন পর তপু পাল্টা ফোন করে ইউরেকা বলে খুশির উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। আসল খবরটা ফোনে-বা ম্যাসেঞ্জারে নয়, পার্কে সামনাসামনি বসে জানায় সে। কারণ সাড়া যে দিয়েছে, সে তপুর ফেসবুক বন্ধু তালিকায় ছিল বটে, কিন্তু ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারে নয়, সরাসরি ফোন করে বলেছে - আমি আপনার স্ট্যাটাস নিয়ে কথা বলতে চাই। তারপর সশরীরে বাসাতেও এসেছিল। তপু ও তার স্ত্রীর সামনেই কথাবার্তা হয়েছে।

নাম তার কৃষ্ণা অধিকারী। বয়স ষাটের কাছাকাছি। হালকা-পাতলা গড়ন বলে কম মনে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলের সংসারে ছিল। নাতিও আছে একটি। পুত্রবধূর খোঁটা খেয়ে ছেলের সংসারে বোঝা হয়ে থাকেনি। প্রাইভেট ক্লিনিকে নার্সিং-এর চাকরিতে ছিল। নিজের পেশার ওপর নির্ভর করে আলাদা একা থাকার সময়ে তপংকর চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার আমেরিকান ছেলের সুবাদে। আমেরিকান সন্তানদের জন্য বেবিসিটার হিসেবে দেশে থেকে একটি মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছিল তপুর ছেলে। তপুকে এই মেয়ের সন্ধান দিয়েছিল তার এক খ্রিস্টান বন্ধু। প্রার্থী হিসেবে কৃষ্ণা তখন বাসায় এসেছিল কয়েকবার। তার বায়োডাটা ও ছবিও পাঠিয়েছিল ছেলের ই-মেইলে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকা যাওয়া হয়নি কৃষ্ণা অধিকারীর। বাস্তব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবার পর, ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে কবে যে বন্ধু হয়েছে তপুর মনে ছিল না। স্ত্রীহারা নিঃসঙ্গ বন্ধুর পাত্রী হিসেবে তার ফোন পেয়ে তাই চমকে উঠেছিল। সে বর্তমানে চাকরিহারা এবং অর্থনৈতিক সংকটে আছে। ছেলের সংসারে জায়গা নেই। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এমতাবস্থায় তপুর অতি পরিচিত বন্ধুটি যদি দেখেশুনে তাকে যোগ্য মনে করে, তবে ধর্মান্তরিত হয়ে বৈধ স্ত্রী হতে আপত্তি নেই তার। অতঃপর এক বাসায় থেকে অথবা আলাদা থেকে মাঝে মাঝে স্বামীসেবা করতে পারবে সে। এমনকি বৈধ স্ত্রীর মর্যাদা না দিয়েও মাসিক বেতনের বিনিময়ে নার্সিং-এর কাজ দিলেও উপকার হবে তার। এখন পাত্র কোন পথে এগোবে, দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকে।

ফেসবুকের মাধ্যমে পাত্রীর সন্ধান এসেছে বলে প্রথমে তপুর প্রস্তাবটাকে একদম আমল দিতে চায় না সে। মনে হয়, ঘরের নাতির মতো কেউ ফেসবুকের ভুয়া আইডি নিয়ে তার সঙ্গে রগড় করছে। কৃষ্ণা অধিকারীর সঙ্গে তপুর গোপন শরীরী সম্পর্ক নিয়েও সন্দেহ জাগে। আবার পাত্রী প্রয়োজনে ধর্মান্তরিত হয়ে তার আইনসিদ্ধ স্ত্রীর মর্যাদা পেতে সম্মত শুনে প্রতারিত হওয়ার ভয়ও জাগে। টাকার জন্য লোভী মানুষ এ যুগে কী না করতে পারে? কিন্তু সন্দেহ অবিশ্বাস দূর করার জন্য ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বক্তব্যকে মোটেও ফেলনা বা ফালতু ভাবতে পারে না সে।

তপু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘দেখ দোস্ত, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হয়েছে আমাদের। আমি চাই, আমরা চলে যাওয়ার পর পৃথিবীতে মানুষে মানুষে বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্ক এবং মানবতার ধারাটা বজায় থাকুক। নানারকম ভঙ্গুরতা আর সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে আছি আমরা। তুই তো জানিস, ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানি নাই বলে একটি মুসলমান মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। সেই মেয়েটাকে ভুলতে পারিনি এখনো। শেষ বয়সে কৃষ্ণা অধিকারীর সাক্ষাৎ পাওয়াটা তোর সৌভাগ্য বলে মনে হয়েছে আমার। মেয়েটাকে যদি তোর পছন্দ হয় এবং আইনগত ভাবে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিস, তাহলে জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদির দেয়াল ভেঙে চিরন্তন মানবতা ও ভালোবাসার ধারাকে কন্ট্রিবিউট করা হবে। ভবিষ্যতে যদি তোর সন্তানেরা জানাতে পারে এবং তোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে না চায়, তা হলে অন্তত নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবি। মৃত্যুর পরও কৃষ্ণা অধিকারীর মাধ্যমে তোর ভালোবাসা-মানবতা যাই বলিস, বেঁচে থাকবে। এখন দেখেশুনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তোর।’

এরপর তপুকে আর সন্দেহ-অবিশ্বাস করে সে কোন যুক্তিতে? এমন কি তাকে বাদ দিয়ে, কৃষ্ণা অধিকারীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ও যোগাযোগেও সম্মত হয় না। অতএব, এক সপ্তাহের মধ্যে চন্দ্রিমা উদ্যানে কৃষ্ণা-অধিকারীর সঙ্গে বন্ধুকে পরিচিত করিয়ে, দু’জনকে একান্তে কথা বলার সুযোগ দিয়ে তপংকর চক্রবর্তী তার দায়িত্বে ইতি টানে।

প্রথম দর্শনে প্রেম কি জিনিস, সেটা শেষ বয়সে এসে উপলব্ধি করে নিঃসঙ্গ লোকটি। কারণ প্রথম সাক্ষাতেই কৃষ্ণাকে পছন্দ হয় তার। নবীন যৌবনের মতো রোমাঞ্চ ও নায়ক হওয়ার মতো উত্তেজনাও অনুভব করে কিছুটা। ভদ্রমহিলা যেন তার হবার জন্য তৈরি হয়েই এসেছে। নাম কৃষ্ণা হলেও রঙটা ফর্সাই। শুরুতে ফোন-নাম্বার বিনিময়, ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জারেও যোগাযোগের রাস্তা চিনিয়ে নিচে তপংকর বাবু ও ওপরে স্রষ্ঠাকেও ধন্যবাদ জানায় কৃষ্ণা এমন যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য; কিন্তু মানুষের মন বড় জটিল জিনিস। আগ্রহ-আসক্তি উছলে উঠতে চায় বলে প্রতিরোধের বাঁধ সৃষ্টি করতে লোকটি বলে, ‘এই বয়সে ভুল করলে মারাত্মক সাফার করতে হবে হবে দু’জনকেই। পরস্পরকে ভালোভাবে জেনে চিন্তাভাবনা করে এগোতে হবে আমাদের।’

একমত হয়ে মেয়েটি বলে, ‘আপনি যা জানতে চাইবেন সব সত্য জবাব দেব। হোস্টেলে রুমে আমি একা থাকি। রাত ১০টার পর আপনি হোয়াটসঅ্যাপ বা ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল দিতে পারেন। এখন কোনো জব নেই বলে ঘনঘন দেখাসাক্ষাতেও আপত্তি নেই আমার। অবশ্য সেক্ষেত্রে রিকশাভাড়া ও বাদাম কেনার টাকা আপনাকে দিতে হবে।’

টাকার কথা উল্লেখ করায় লোকটি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মহিলার হাসিমুখে পেশাদার কলগার্লের ছায়া খোঁজে; কিন্তু কৃষ্ণা অধিকারী তার অর্থনৈতিক সংকট ও সংকটের কারণ ব্যাখ্যা দিলে তার প্রতিটি কথাকেই সত্য মনে হয়। এরপরও পরস্পরকে জানা আর দেখারও যেন শেষ হতে চায় না।

প্রথম সাক্ষাতের পর বাসায় লোকটির একাকীত্ব শিষ দিয়ে উড়িয়ে দিতে যখন তখন ফোন করে কৃষ্ণা। রাতে ঘুম হয় না বলে ভিডিওকল দেয় লোকটি। ইনবক্সে কৃষ্ণা নিজের ও পরিবারের ছবিও পাঠায়। দু’জনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কতরকম যে সওয়াল-জবাব চলে! প্রায় প্রতিদিনই কানে কানে কথাবার্তা ও ফোনে দেখাদেখির পরও সম্ভাব্য হবু স্ত্রীকে নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই লোকটার। কৃষ্ণার পিরিয়ড বন্ধ হয়েছে তো? ঘুরেফিরে আর্থিক সংকটের উল্লেখ তার টাকা খসাবার ছল নয় তো? বাইরে থেকে ঘুরেফিরে দেখে কৃষ্ণার স্তনের অবয়ব কিংবা শারীরিক সক্ষমতা স্পষ্ট বোঝা যায় না। আশার কথা যে, লোকটি যদি মহিলাকে এখন দেড় লাখ টাকা ধার হিসেবে দেয়, তা হলে কক্সবাজার কিংবা নিরাপদ কোনো রিসোর্টে আগাম স্ত্রী হিসেবে বেড়াতে যেতেও রাজি হবে সে। তারপর গোপন অভিসারে বোঝাপড়া চূড়ান্ত হলে সম্পর্কটা যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, ভেবে কুল পায় না লোকটি।

খুব সতর্ক থাকার পরও কেন, কখন এবং কীভাবে অপার সম্ভাবনাময় গোপন সম্পর্কটার ভিত পরিবারের সবার কাছে উন্মোচিত হতে শুরু করেছিল, জানে না লোকটি। কৃষ্ণার সঙ্গে একদিন ফোনে কথা বলার সময় পুত্রবধূর চোখে প্রথমে সন্দেহ চলকে উঠতে দেখেছিল। অথবা হতে পারে নিজের মধ্যে অপরাধের ছায়া চলকে উঠেছিল বলে পুত্রবধূকে সন্দেহ করেছিল সে। কৃষ্ণার সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তার কক্সবাজারে অভিসারে যাওয়ার প্রোগ্রামটি পাকা হওয়ার পরদিনই, গোটা পরিবারের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে সে।

এগার বছরের নাতি রুহু প্রথম বিজয়গর্বে ঘোষণা করে, ‘দাদু আজ তোমার বিচার বসবে। আমি তোমার গার্লফ্রেন্ডের সব ডকুমেন্টস হ্যাক করে মাকে দেখিয়েছি। তোমার ভিডিওকলও রেকর্ড করেছি। কী মনে করো তুমি আমাকে? কম্পিউটার প্রোগ্রামার শুধু নয়, বড় হয়ে সিআইডি ইনস্পেকটর জেনারেল হব আমি।’

দাদুর নতুন ফোন নিয়ে নাতির বাড়াবাড়ি কৌতূহল দেখেই সন্দেহ জেগেছিল একদিন। মায়ের হয়ে রুহু যে দাদুর ওপর গোয়েন্দাগিরি করছিল, সেটা বুঝতে দেরি হয়েছে বোকা লোকটির। বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ছোট ছেলে সস্ত্রীক বড় ভাইয়ের বাসায় আসে একদিন। মেয়ে বিদেশ থেকে আসতে না পারলেও ভিডিওকলে পারিবারিক কনফারেন্সে যোগ দেয়। অনুপস্থিত মেয়েই কান্নার গলায় সকলের হয়ে পিতার উদ্দেশে অভিযোগ উত্থাপন করে প্রথম, ‘মা মরতে না মরতেই তুমি এসব কী শুরু করেছো বাবা? রুহু তোমার গালফ্রেন্ডের সব ডকুমেন্টস আমার কাছেও পাঠিয়েছে। কে এই কৃষ্ণা অধিকারী? কী সম্পর্ক তার সঙ্গে তোমার?

কন্যার জিজ্ঞাসা তীব্র হয়ে দু’ভাই ও তাদের স্ত্রীদের চোখেও জ্বলজ্বল করে। মাস খানেকের কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাতের পর কৃষ্ণার পরিচয় নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়। উপরন্তু সম্পর্কের বিস্তার এতটাই ঘটেছে এবং কৃষ্ণা এত বেশি কল্পনা ও কামনার রঙে গড়া তার পরিচয়, এক কথায় কী জবাব দেবে সে? তারপরও নির্বিকার কণ্ঠে সত্য কথাই বলে লোকটি, ‘কৃষ্ণা অধিকারী একজন অভাবগ্রস্ত খ্রিস্টান, বিধবা ভদ্র মহিলা।’

বড় ছেলের আক্রমণাত্মক জবাব, ‘তা অভাবগ্রস্ত বিধবা মহিলাকে ইতিমধ্যে দেড়লাখ টাকার চেক দিয়েছো। পেনশনের উত্তরাধিকারী করারও আশ্বাস দিয়েছো! এরপর তাকে তোমার সম্পত্তির আর কী ভাগ দিতে চাও শুনি।’

‘তোমরা কি কৃষ্ণার ব্যাপারে রুহুকে গোয়েন্দা নিয়োগ ছাড়াও, আমার বন্ধু তপুর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছো নাকি?’

ছোট ছেলে জবাব দেয়, ‘তপু কাকুই যত নষ্টের গোড়া। লোকটা নিজে ধর্মকর্ম মানে না। আমেরিকায় থেকে ভোগবাদী হয়েছে। সে তোমাকে কুবুদ্ধি দিয়ে ডোবানোর তালে আছে বাবা।’

পুঁজিবাদ-ভোগবাদ বিরোধী বন্ধুকে সে ছেলেদের তুলনায় বেশি জানে বলে তার সাম্প্রতিক কথাটিও মনে পড়ে, ‘কৃষ্ণার কাছে তুই কী পাবি না পাবি জানি না দোস্ত। তবে তোর মৃত্যুর পর তোর সরকারি পেনশনটা কৃষ্ণা ভোগ করার রাইট পাবে জানলে একটা মানবিক কাজ করতে পারলাম বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারব আমি।’

অবশেষে দীর্ঘশ্বাাস ছেড়ে, গলা পরিষ্কার করে শান্ত কণ্ঠেই পরিবারকে সিদ্ধান্ত জানায় সে, ‘আমার সব ভালো-মন্দের উত্তরাধিকারী তোমরাই তো হবে। আশা করি, কৃষ্ণার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সঠিক ধরনটিও আমার মৃত্যুর পর অবশ্যই জানতে পারবে তোমরা।’  

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh