রহিম বাদশা অথবা চোরের গল্প

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

অত্র এলাকার জনসাধারণ চোর উচ্চারণ করতে পারে না, তারা মুখ গোল করে চোরকে বলে ‘চুর’।

‘চুর’ তাদের জীবনযাপনের অবধারিত সঙ্গী, বছরের যে কোনো দিন যে কারও বাড়িতে ঘোর অমাবস্যা কিংবা ঝুম বৃষ্টির রাতে, অন্ধকারের সঙ্গে নীরবে নিজের গায়ের রঙ মিলিয়ে ‘চুর’ আসবে রাতের গোপন মেহমান হিসেবে এবং অতীব সতর্কতার সঙ্গে ঘুমন্ত গৃহস্থকে না জাগিয়ে তার পেশাগত দায়িত্ব নিঃশব্দে পালন করে চলে যাবে। এটা এই এলাকার জনগণের কাছে সেই সময় এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে তারা কাজের ফাঁকে সময় পেলেই ‘চুর’ এবং তার স্মরণীয় সব চুরির গল্পে মেতে উঠতো। সব শেষে ঘটনার নায়ক ‘চুর’ কেমন কায়দা করে কাউকে না জাগিয়ে সবাইকে স্রেফ ‘বেক্কল’ বানিয়ে কি কি সব দামি, কম-দামি জিনিসপত্র নিয়ে নিমেষে হাওয়া হয়ে গেছে তাই ভেবে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে ব্যাপক আনন্দ পেতেও ভালোবাসতো তারা। 

রহিমুদ্দিন হচ্ছে সেই সময়ের একজন বিখ্যাত ‘চুর’। তবে সে কছিম কিংবা আশান চুরার মতো সাধারণ চুর না, তার বিশেষত্ব হচ্ছে শুধু গরু চুরি করা, অন্য কিছু না। গ্রামের গরুর মালিকরা তার উৎপাতে ডাগর হয়ে ওঠা সুন্দরী মেয়ের দরিদ্র বাপের মতোই রীতিমতো তটস্থ থাকত, তবে রহিম ছিল বড়ই বিবেচক গোছের ‘চুর’ যে গৃহস্থের সম্বল একটি মাত্র গরু, সেই গৃহস্থের গোয়ালে হানা দিয়ে তাকে অসহায় পথের ফকির বানানোর কোনো ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য তার একদম ছিল না, 

‘আমি কাজ করি বিবেচনা কইরা, মানুষরে বিপদে ফেলা তো আমার কাজ না’ 

রহিমুদ্দি তার গুণমুগ্ধ ইয়ার দোস্তদের বলত। চুরি করা তার কাছে ছিল যত্ন করে করার মতো একটা শিল্পকর্ম, মজাক করনের মতো একটা আরামের খেলা, 

‘আজফর বেপারির সাদা রঙের বাছুরটা যেইদিন আনলাম সেই দিন হইল কি শুনো, শালার বাছুরের হাম্বা হাম্বা শুইন্যা বেপারি সাবের ঘুম গেল ভাইঙ্গা, তাড়াতাড়ির মধ্যে কই পলাই? বাছুরের মুখ দুই হাতে টিপ দিয়া ধইরা গিয়া ঢুকলাম পাকঘরের পিছনের জাংলার মধ্যে, বেপারি সাব এইদিকে টর্চ মারে, হেই দিকে টর্চ মারে, আমি তো বাছুরটারে দুই ঠ্যাংয়ের মধ্যে চিপা দিয়া ধইরা ঝিম মাইরা জাংলার মধ্যে বসা, খালি ডরাইতাছি কুন সময় বেপারি সাব জাংলার মধ্যে টচ মারে আর আমি ধরা পড়ি, কিন্তু মানির মান তো আল্লাহই রাখে, আল্লাহর কুদরতে বেপারি সাব জাংলার মধ্যে টর্চও মারল না, আমারেও দেখল না’

‘আরেকবার করলাম কি, মিয়া বাড়ির লাল গরুডা আইন্যা আলকাতরা দিয়া রাইতের মইধ্যে কালা গরু বানায়া ফালাইলাম, অখন মিয়াসাব আইসা তার লাল গরু খুঁজে, আরে লাল গরু কি আর লাল আছেনি, যে মিয়া সাব খুঁইজ্যা পাইবো? হিঃ হিঃ হিঃ,’ 

রহিমুদ্দির চিকন চোরামি বুদ্ধির কাছে হার মেনে যে লোকটা গরু হারিয়ে বোকা হতো সেও নাকি পরে সমস্ত ঘটনা শুনে তার বুদ্ধির তারিফ না করে পারতো না, 

‘বেডা চুর একখান, ঝানু চুর!’

নিজেদের তল্লাটে এমন একটা গুণবান ‘চুর’ থাকায় মদনপুরের লোকজন সেই সময় এক ধরনের লজ্জা মোড়ানো চাপা গর্বও অনুভব করত। 

চুরি করা ছাড়াও রহিমুদ্দি কাজের মধ্যে আরেকটা কাজ করত সেটা হলো যাত্রা পালা করা। অবশ্য সব যাত্রাতেই রহিমুদ্দি ‘পাট’ করত না। এক্ষেত্রেও তার একটা বিশেষ বিবেচনার বিষয় ছিল। সেটি হচ্ছে নিজের নাম এবং আকৃতির প্রতি সুবিচার করা। প্রতি বছরই শুধু রূপবান যাত্রা পালায় রহিমুদ্দি একাব্বর বাদশার পুত্র রহিম বাদশার কিশোর কিংবা তরুণ বয়সের রোলে পাট করত। শীতের রাতে মাঠের মধ্যে চারপাশ খোলা মঞ্চে উঠে হ্যাজাক লাইটের চড়া আলোতে রহিমুদ্দি তার ছোটখাটো চিকন চাকন কিশোর-সুলভ দেহ নিয়ে রাজপুত্র রহিমের ভূমিকায় যখন করুণ মধুর গলায় গান ধরত, 

‘ছিড়া জামা, ছিড়া-আ ধূতিরে

ও আল্লা আমার ভাইগ্যে হইলোরে, 

আমার আল্লা, আল্লারে 

কেবা প্রাণের বান্ধব হইয়ারে কিনা দিবে জামারে 

আমার আল্লা, আল্লারে ...

তখন অনেক নারী দর্শকই চোখে শাড়ির আঁচল চেপে তাদের রুদ্ধ আবেগ চাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করত আর পুরুষেরা এই নিষ্পাপ রাজপুত্রের ‘চুর’ পরিচয় নিয়ে যেন নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়তো। 

তবে যাত্রার মৌসুমে গ্রামের লোকজন একটু শান্তিতে থাকত এই ভেবে যে, রহিম বাদশা এই সময়ে তার অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সম্ভবত গোয়াল ঘরে তাদের গরুগুলো নিরাপদ থাকবে। থাকতও তাই, কিন্তু হঠাৎ এক যাত্রার মৌসুমেই খোনকার বাড়ির একটা দুধেল গরু চুরি গেলে গ্রামের লোকজন ভাবতে শুরু করে তবে কি অত্র অঞ্চলে মদনপুরের রহিমুদ্দির চাইতে বড় কোন ‘চুর’-এর আনাগোনা শুরু হইল?

কেননা তারা নিজ চোখে দেখেছে যেইদিন গরু চুরি গেছে সেইদিনও প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত রহিমুদ্দি যাত্রা মঞ্চে রহিম বাদশার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করে গেছে। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে টেনে টেনে সংলাপ বলেছে, 

‘মাসীমা, মাসীমা আমার বুঝি আর ইশকুলে যাওয়া হবে না, মাসীমা’, 

‘কেন রহিম, কি হয়েছে?’

‘সায়েদ বাদশার আদেশ, আগামীকাল ইশকুলে যেতে হলে জড়ির জামা আর উড়িয়াবাজ ঘোড়া নিয়ে যেতে হবে, তা না হলে নাকি আমাকে ক্লাসেই ঢুকতে দেবে না’ 

মাসীমা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন ‘দুর পাগল ছেলে এজন্য তুমি কাঁদছো? চলো আমার সঙ্গে, তোমার দিদি শুনলে তোমাকে সবই কিনে দেবে’ 

দর্শকরা এরপর নিদারুণ উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করেছে কিভাবে রহিম বাদশার জড়ির জামা আর উড়িয়াবাজ ঘোড়া সমস্যার সমাধান হয় তা দেখার জন্য এবং পরবর্তী দৃশ্য গুলিতে তারা সেটি দেখেছেও। এইসব কারণে এলাকার জনসাধারণ মোটামুটি নিশ্চিত হয় যে খোনকার বাড়ির দুধেল গাভীর চুর রহিমুদ্দি না; কিন্তু নতুন ও অপরিচিত এই চুর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো এবং তার সত্যিকারের পরিচয়ই বা কি এসব নিয়ে গ্রামবাসী তলে তলে বেশ চিন্তিতই হয়ে পড়ে। 

অবশ্য অল্প কিছুদিন পরই গ্রামবাসীর সেই নিদারুণ চিন্তার অবসান ঘটে যখন রহিমুদ্দি তার ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে এ কথা বলে যে, 

‘আরে বেডা, অন্য কেউ না, আমিই, হিঃ হিঃ আমিই এইবারও কামডা করছি। কুন সময়? আরে, যাত্রায় সেই সময় ইন্টারভেল পরছিল, সেই ইন্টারভেলের সময়, হিঃ হিঃ’, 

রহিমুদ্দির চুরিবিষয়ক এমন নিত্য নতুন উদ্ভাবনা গ্রামবাসীর একঘেয়ে জীবনে যেন নতুনত্বের ছোঁয়া দিয়ে যায়, একই সঙ্গে তারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, এই ভেবে যে, যাক বাবা, গ্রামে নতুন কোন চুরের আবির্ভাব ঘটেনি, আমাদের ঘরের পোলা বাপের বেডা রহিমুদ্দিই চুর। তবে এরপর থেকে তারা যাত্রার দিনগুলিতেও নিয়মমাফিক সতর্কতা অবলম্বন করতে থাকে। 

তারপর, কতদিন পর হবে, একবছর কিংবা ছয় মাস, গ্রামের লোকেরা হঠাৎ একদিন সচেতন হয়ে আবিষ্কার করে তাদের গ্রামে গরু চুরি কমে গেছে কিংবা গত ছয় মাস গ্রামের কারও গরুই চুরি যায় নাই। রহিমুদ্দিন কি তবে চুরি ভুলে ভালো মানুষ হয়ে গেল? ছেড়ে দিল তার এতদিনের প্রচলিত পেশা? চুর হিসেবে তার ঈর্ষণীয় দক্ষতায় তবে কি মরচে পড়ল? কি হলো রহিমুদ্দির?

গ্রামবাসী কৌতূহলবশত খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করল এবং অচিরেই তারা আবিষ্কার করে পুলকিত হলো যে রহিমুদ্দিন প্রেমে পড়েছে। কার? না, উজ্জ্বলা গোমেজের। যাত্রায় তাজেল কন্যার ভূমিকায় অভিনয় করে যে লম্বা-চুড়া ফর্সা মেয়েটি, তার নামই তো উজ্জ্বলা গোমেজ। খ্রিস্টান মেয়ে। কালীগঞ্জে বাড়ি। গঠন গাঠন সুন্দর, চেহারা ছবিও খারাপ না। যাত্রা মঞ্চে সেই তো রহিমের সঙ্গে মিষ্টি কণ্ঠে গানের সুরে টান দেয়-

আমায় যদি ভালো বাসো গো, ও রহিম যৌবন করব দান ও গো, 

শোন রহিম রহিম গো 

আমায় যদি ভালো বাসো গো

ও রহিম, কিন্যা দিবো ঘোড়াগো ...

-কিন্তু এদিকে রহিমুদ্দির ঘরে যে তার অল্প বয়সে বিয়ে করা বউ দুঃখিনী শরিফা রয়ে গেছে তার কি হবে? শরীফা তো যাত্রার মেয়েদের মতো অতো ছলা-কলা, অতো কায়দা কানুন জানে না, সে জানে মাটির চুলার মধ্যে ভিজা লাকড়ি ঠেসে ধুয়া বানাতে, তারপর সেই ধুয়ার ছলনায় বুকের দুঃখ আড়াল করে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে, সে তো জানে শুধু ডেকচি ভরা ভাত রানতে, পাতিল ভরা সিদল শুঁটকির তরকারি রানতে আর জানে সুঁই সুতা দিয়ে পুরান কাপড়ের কাঁথা সেলাই করতে, সে কিভাবে তাজেল কন্যার প্রেমে মুগ্ধ স্বামীকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনবে? গ্রামবাসী ভাবে, শরীফা কি তবে এখন রূপবানের মতো করে করুণ গলায় গাইবে, 

‘ও, ওরে শ্যাম বন্ধুর কাছে অবলা মিনতি করি 

কোন দোষে পিরীতি 

বন্ধু তুমি ছাড়িলা...’ 

নাকি সে রহিমের প্রেমে মজে থাকা তাজেলকন্যা রূপ গরবিনী উজ্জ্বলা গোমেজের কাছে গিয়ে অভাগী রূপবানের মতোই তাকে সতর্ক করে দিতে গাইবে, 

‘শোন তাজেল গো, মন না জেনে প্রেমে মইজো না 

মন না জেনে, ও প্রেমে মইজো না ...’

হায়! পোড়া কপালী আভাগির বেটি শরিফা তো সেটাও পারে না। ‘তোমার অভাগিনী দাসী কাঁদে এ এ রে এ’ বলে আকুল ক্রন্দন ছাড়া আর কিছুই যেন করার নেই তার। লোকমুখে শোনা যায় রহিমুদ্দি নাকি উজ্জ্বলা গেমেজকে সঙ্গে নিয়ে এ গ্রাম ছেড়ে দূরের শহরে গিয়ে ঘর বেঁধেছে। উজ্জ্বলা পছন্দ করে না বলে রহিমুদ্দি আপাতত বাদ দিয়েছে চুরি-চামারি, একটা ছোট খাটো লন্ড্রির দোকানে সে সারাদিন গায়ের ঘাম ঝরিয়ে কাপড় ইস্ত্রি করে। কিন্তু গ্রাম দেশে পড়ে থাকা চুরের বৌ-এর ছাপ মারা শরীফা এখন করে কী? খায় কী? সে তো তাদের গ্রামের আরও অনেক নারীর মতোই জানে, ‘ভাদ্র মাসে তালের পিঠা, যৌবনকালে স্বামী মিঠা গো’ আর ‘ভ্রমর বিনে ফুলের মধু’ যে শুকাবেই তাতে কি কারও কোনো সন্দেহ আছে? 

শরীফা তখন জান মান বাঁচাতে গ্রামেরই এক বিপত্নীক মধ্যবয়সী মুদী দোকানদারকে ধর্ম বাপ ডেকে তার বাড়িতে আশ্রয় নেয় এবং বাড়ি ঘরের যাবতীয় কাজ কর্ম করে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সুন্দর বাস্তবায়ন ঘটাতে থাকে, গ্রামের দুষ্ট লোকেরা অবশ্য মুদি দোকানদারের সঙ্গে শরীফার অন্যরকম সম্পর্কের কথা গোপনে বলাবলি করতে পছন্দ করত, তবে সেই সম্পর্কের কোন চাক্ষুষ প্রমাণ কখনো পাওয়া যায় নাই। 

এদিকে গ্রামের বয়স্ক ও বৃদ্ধ নারীরা তখন শরীফার সঙ্গে যাত্রা-পালার রূপবান কন্যার অনেক মিল খুঁজে পান, তাদের মনে পড়ে, রূপবানও শরীফার মতোই বিপদে পড়ে জংলী সর্দারকে ধর্মবাপ ডেকেছিল, আবার রূপবানের মতো শরীফারও বিয়ে হয়েছিল বারো বছর বয়সে। গ্রামের তরুণীরা তখন বৃদ্ধাদের মুখ ঝামটে বলে,

‘তাইলে এইটাও কও যে বুলে, শরীফার কুলে তখন ছিল তার স্বামী, বারো দিনের এক শিশু’ 

হ্যাঁ, কবে জানি, সেটা সাদা চুলের বৃদ্ধাদের ঠিক মনে পড়ে না, তবে শরীফার কোলে কাপড়ে মোড়ানো এক শিশুকেও তো একবার দেখেছিলেন তারা আর সেই শিশুও তো ছিল এক ছেলে শিশু। 

‘আরে ওইটা রহিম বাদশা না, শরীফার কোলে ওইটা ছিল রহিমুদ্দির পোলা ..’ 

বউ ঝিরা আঁচল মুখে দিয়ে হাসি চেপে গ্রামের বৃদ্ধা মুরুব্বিদের ভুল ধরিয়ে দেয়; কিন্তু কুজো হয়ে যাওয়া বৃদ্ধাদের ভুল ভাঙে না, তারা নিজেদের বিশ্বাসে অটল থাকে যেন স্বামী আর পুত্রের মধ্যে আদৌ কোনো ভেদ নাই, তারা দুই জনই রমণীর কোলে অতি যত্নে লালিত পালিত হয়, তারপর হাঁটতে শিখে গেলে তারা দু’জনই নারীকে পরিত্যাগ করে। আর সম্ভবত সে কারণেই চোখে ছানি পড়া সাদা চুলের বৃদ্ধাদের বার বার মনে হতে থাকে বারো দিনের সেই শিশুই ছিল শরীফার স্বামী, যে এখন লায়েক হয়ে দৌড় দিতে শিখেছে আর দুঃখিনী শরীফাকে পেছনে ফেলে ছুটেছে অন্য ফুলের মধু খেতে। 

বৃদ্ধারা শীতের রোদে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে ভাবতে আরও ভালোবাসে যাত্রার রূপবানের মতোই হয়তো শরীফা মনে মনে গানের সুরে বলে, ‘দুঃখ যে মনের মাঝে হানিল আমায়, তারে নি ভালো রাখিবেন খোদায়’। নিজেদের কোচকানো কপালের ভাঁজ আরও গভীর করে বৃদ্ধারা ভাবেন, যাত্রার নায়িকা উজ্জ্বলা গোমেজ কেনো শুধু শুধু রহিমুদ্দিকে নিয়ে গেল? তার কি মাঝির অভাব হয়েছে? হয়ে থাকলে তো সে রাস্তা থেকে দশটি মাঝি ধরে নিতে পারতো, পোড়া কপালী ভ্যাবলা শরীফার তো সেই ক্ষমতাও নেই। 

গ্রামের তরুণীরা অবশ্য শতমুখে দোষ দিতো রহিমুদ্দিকেই, বোকা বুড়িদের সঙ্গে তর্ক করে তারা বলতো, 

‘উজ্জ্বলা গোমেজের কি দোষ বলো? হয়তো দেখগো, সে জানেই না যে রহিমুদ্দির আরেকটা বউ আছে, হয়তো রহিমুদ্দি উজ্জ্বলা গোমজেকে বলেছে, সে আবিয়াতো পুরুষ, তার কোনো পরিবার নাই...

রহিমুদ্দিন আসলে প্রকৃতপক্ষে কি বলে উজ্জ্বলা গোমেজকে ভুলিয়েছিল কিংবা কিশোরসুলভ চেহারার রহিমুদ্দির মধ্যে কি দেখে উজ্জ্বলা গোমেজ মজেছিল তা অত্র এলাকার জনসাধারণ আজো বুঝতে কিংবা জানতে পারে নাই। 

তবে তারা আমাকে রহিমুদ্দির প্রত্যাবর্তন ও তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে বলেছিল। 

অনেক দিন, নাকি অল্পদিন, গ্রামের লোকেরা তারিখটা ঠিক বলতে পারবে না, সম্ভবত কোনো এক শীতকালে একটা শিয়াল রঙের চাদরে মুখ মাথা ঢেকে সত্যিকারের চোরের মতোই রহিমুদ্দি চুর তার নিজ গ্রামে, তার ফেলে যাওয়া বড় বউ চির দুঃখী শরীফার কাছে ফিরে এসেছিল। ততদিনে অবশ্য রহিমুদ্দির কিশোরসুলভ লাবণ্য আর রস রসিকতার সবই প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল, শরিফারও তখন একই অবস্থা, হেলায় হেলায় তার সাধের যৌবনও তখন বিগতপ্রায়। তবে রহিমুদ্দি চলে যাওয়াতে গ্রামের লোকজন শরীফাকে যেমন কোনো রা করতে দেখেনি, তার ফিরে আসাতেও তেমনি শরিফার মধ্যে কোন চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়নি। 

লোকে বলে, উজ্জ্বলা গোমেজই নাকি রহিম বাদশা’র মধ্যে বাদশাসুলভ কোন গুণ দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে আকবর বাদশার রোল করত যে উঁচা লম্বা নিজাম শেখ তার সঙ্গে চলে গিয়েছিল চট্টগ্রামে, রহিমুদ্দিকে ব্যবহৃত পোষাকের মতো পেছনে ফেলে। 

পরিত্যক্ত রহিমুদ্দিন গ্রামে এসে প্রথম কয়েক দিন নতুন বউয়ের মতো চুপচাপ বসে কাটালেও কিছুদিন পরে আর কিছু করতে না পেরে আবার নতুন উদ্যমে তার পুরনো পেশার চর্চা শুরু করে। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগবিহীন থাকায় মদনপুর গ্রাম যে তখন আর আগের গ্রাম ছিল না, রহিমুদ্দিন চুর সেটা বুঝতে পারে নাই, বুঝলে হয়তো এমন ‘জড়ভরত’ পরিণতি, তার হতো না। রহিমুদ্দি বুঝতে পারে নাই লোকজন এখন আর রাত জেগে খোলা মাঠে রূপবানের যাত্রা দেখে না। এখনকার গ্রামে লম্বা তার বেয়ে বিদ্যুৎ এসেছে, এখনকার গ্রামে ইটের দালানের সংখ্যা বেড়েছে, এখন বাজারে গেলে তিন চারটা চায়ের দোকানে হিন্দি গানের সুর বাজতে শোনা যায়, এখন বাজারের পেছনে ৫ টাকার টিকিট কেটে কাপড় ঘেরা ঘরে, শিশু থেকে শুরু করে ছেলে ছোকড়ারা প্রাপ্তবয়স্কদের গোপন ছবি ‘বুলু ফিলিম’ দেখতে পায়। বেচারা রহিমুদ্দি সম্ভবত মদনপুরের এই পরিবর্তনটা ধরতে পারে নাই। আর সেই জন্যই একদিন এক অমাবস্যার রাতে সে জলিল মৃধার গরু চুরি করতে যায়। 

জলিল মৃধা, যে এখন এই গ্রামের সবচে টাকাঅলা লোক, তার যে বর্ডারে ইন্ডিয়ার ব্যবসা আছে, গ্রামের সঙ্গে বহুদিন বিচ্ছিন্ন থাকায় সে কথাও সম্ভবত জানা ছিল না রহিমুদ্দি চুরের। ফলে জলিল মৃধার জোয়ান সাগরেদ কিংবা ষন্ডা পান্ডারা তাকে চোরাই মাল সমেত হতে নাতে ধরে ফেললে গ্রামের লোক বুঝতে পারে এইবার রহিমুদ্দির খবর আছে। যদিও বোকাচুদা রহিমুদ্দি যেন কিছুই বুঝে না, সে হয়তো মনে মনে ভাবে, আহা, কি আর করবে? না হয় দুই চাইরটা উল্টা সিধা চড় থাপ্পর দিবে, না হয় কিছু মাইর ধোর করবে, তা ‘চুর’দের সেই মাইর সহ্য করার প্র্যাকটিস আছে। 

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘটনা এতো সহজ ছিল না কারণ জলিল মৃধা আসলে জনগণের কাছ থেকে কিছু ভয়মিশ্রিত সমীহ অর্জন করতে চেয়েছিল এবং সেই মোক্ষম সময়ে একটি গরু চোর ধরা পরায় জনগণকে ভয় দেখানোর একটি চমৎকার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি সে। 

গরু চোর রহিমুদ্দিকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল জলিল মৃধার উঠানের কোণায়, একটা খসখসে খেজুর গাছের সঙ্গে, রহিমুদ্দি অলস ভঙ্গীতে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সম্ভবত জলিল মৃধার বাড়ির নতুন ফেঁপে ওঠা প্রাচুর্য দেখছিল। আগের ভাঙাচোরা টিনের ঘরের জায়গায় এখন সেখানে তিন তলা সাদা দালান উঠেছে, পূবের ভিটায় আরেকটা দালান তৈরির প্রস্তুতি চলছে, এক কোণায় স্তুপ করে রাখা হয়েছে ইট, বালি, রড, সিমেন্ট। মোটা সোটা মোরগ, মুরগি বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে উঠানের এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বচ্ছলতা আর সমৃদ্ধির ছাপ চারদিকে... এইসব দেখে দেখে রহিমুদ্দির ঘুম পেলে সে একটা বড় হাই তুলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমায়।

উঠোনের কোণায় ততক্ষণে অনেক কৌতূহলী শিশু এসে দাঁড়িয়েছে, গ্রামের ময়মুরুব্বিরাও একে একে আসতে শুরু করেছেন, বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে অতি উৎসাহী বউঝিরা। 

জলিল মৃধা এদের সকলের মাঝখানে বসে গম্ভীর কণ্ঠে অভিযোগ করে, 

‘চুরির ঘটনা তো এই বারেই প্রথম না, আরও বহুবার সে চুরি করছে, আপনেরা এতদিন এই চুরের বিচার করেন নাই বইল্যা, এরে উপযুক্ত শাস্তি দেন নাই বইল্যা, এ আবার চুরি করার সাহস পাইছে...

গ্রামের লোকজন কথা বলে না। তারা মৃধার টাকার গরমকে ভয় পায়। 

‘এইবার আমি এরে এমন শিক্ষা দিব যে এই চুরা আর কুনোদিন কুনো মানুষের গোয়াল ঘরে ঢুকার সাহস পাবে না...’ 

জলিল মৃধা তার জোয়ান সাগরেদদের ইশারা করে। 

দু’জন মোটা তাজা জোয়ান গিয়ে ঝিমুতে থাকা রহিমুদ্দিকে চেপে ধরে। এবং যা কারও আন্দাজেও ছিল না, যা কেউ কখনো কল্পনাও করেনি, সেই ঘটনাটাই অবলীলায় ঘটায় জলিল মৃধা। সে হিংস্র উল্লাসে উঠানের স্তূপ থেকে একটা চোখা শক্ত লোহার রড গ্রামবাসীর চোখের সামনে রহিমুদ্দি চোরের কানের ভেতর সজোরে ঢুকিয়ে দেয়। 

রহিমুদ্দি চোরের কান থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসে লাল রক্ত। একটা প্রচণ্ড আর্তনাদের শব্দ দশ গ্রামের আসমান ছাড়িয়ে মহাশূন্য পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //