Logo
×

Follow Us

অন্যান্য

এনসিপির শত্রু-মিত্র

Icon

কবীর আলমগীর

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫, ১১:৪০

এনসিপির শত্রু-মিত্র

ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনীতি, নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মনস্তাত্ত্বিক ঔপনিবেশিকতার পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাইছে দলটি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মূল্যায়ন, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের গুণগত সংস্কার ও গণহত্যার বিচারের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ পাওয়া সম্ভব, এমনটিই আশা দলটির। 

জন্মলগ্ন থেকেই এই দলের সামনে একদিকে উজ্জ্বল সম্ভাবনা, অন্যদিকে নানামুখী ষড়যন্ত্রের ঘূর্ণি। এনসিপি যত গতিশীল হচ্ছে রাজনৈতিক শত্রুর সংখ্যা যেন দীর্ঘতর হচ্ছে। কিছু গণমাধ্যমের ‘সংবাদ কৌশল’ এনসিপির বিপক্ষে। ফলে কোথাও ‘তিল পরিমাণ’ অপরাধ থাকলে সেটিকে ‘তাল আকারে’ প্রকাশ করা হচ্ছে। এনসিপির বিপক্ষে শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক বুলিং নেটওয়ার্ক সক্রিয়। যারা এনসিপির সম্ভাবনাময় নেতাদের চরিত্র হননের পাশাপাশি নারী নেত্রীদেরও চরিত্র হননের কৌশল নিয়েছে। সদ্য গড়ে ওঠা তরুণদের এই দলকে রাজনৈতিক ময়দানে প্রতিপক্ষ ভাবা শুরু করেছে ৪৮ বছরের পুরোনো দল বিএনপি। 

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সমাজ বাস্তবতায় গণমাধ্যমগুলোতে বিএনপির প্রভাব কিংবা এনসিপি-বিরোধী প্রভাব স্পষ্ট। বাংলাদেশের বড় অংশের প্রচলিত মিডিয়া বহুদিন ধরেই দুই প্রধান দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক বা করপোরেট স্পন্সররা অতীতের সম্পর্ক, আর্থিক সুবিধা বা নিরাপত্তার জন্য পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। এনসিপি নতুন খেলোয়াড় হিসেবে আসায় এই কাঠামোতে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কেননা এনসিপি কোনো ‘ঐতিহ্যগত’ আনুগত্যের মধ্যে নেই। 

রাজনীতির মাঠে তরুণ এনসিপির কোথাও কোথাও ভুল হতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যমগুলো ভুল শুধরে দেওয়ার জায়গায় যেন বিনাশের পদ্ধতি বাস্তবায়ন করছে। এই মুহূর্তে এনসিপির শত্রু রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত গণমাধ্যম। বিএনপির কিছু নবীন-প্রবীণ নেতা প্রকাশ্যে না হলেও অন্তরালে এনসিপিকে থামাতে চায়। কারণটা রাজনৈতিক। পাশাপাশি এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ করে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) পিছু লেগেছে। এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে ডিজিএফআইয়ের সংস্কার কিংবা বিলুপ্তি চেয়েছেন। আর্মিপন্থি এই গোয়েন্দা সংস্থাকে বাংলাদেশপন্থি হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। এনসিপির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহি, স্বচ্ছতার প্রশ্নটি সামনে এনেছেন। এনসিপি নেতা সারজিস আলমও এনসিপির বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রসঙ্গটি এনেছেন। এনসিপি নেতাদের অভিযোগ ডিজিএফআই নিউজ বা তথ্য দিচ্ছে, গণমাধ্যমগুলো কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া নিউজ করছে। ফলে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সাইবার জগতের অবস্থা আরো জটিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকের কিছু পেইজ, বেনামি আইডি ও সংগঠিত বুলিং টিম নিয়মিত গুজব রটাচ্ছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাইবার টিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতি সক্রিয়। তারা ফটোশপ করা ছবি, ভুয়া ভিডিও ক্লিপ, বিকৃত বক্তব্য ছড়িয়ে এনসিপির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, এনসিপির বিষয়ে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া। কেন এ রকম হচ্ছে? এনসিপির প্রতি এসব প্রচারণার মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকে অনেকেই এনসিপিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে হাস্যরসের মাধ্যমে আক্রমণ করছে। ফেসবুক, টুইটার (এক্স) কিংবা ইউটিউবে দলটির কর্মকাণ্ড, নেতাদের বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থানকে বিকৃত করে মিম, কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র বানানো হয়। এই কন্টেন্টগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না; বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি হয় যেন এনসিপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয়ত, গুজব ও অপপ্রচারও ট্রলের বড় উৎস। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এনসিপিকে ঘিরে নানা অদ্ভুত দাবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যেমন-দলটি গোপনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আঁতাত করছে, বিদেশি অর্থ পাচ্ছে, সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করছে, চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দিচ্ছে প্রভৃতি। ফলে এনসিপির প্রতি ভুল বার্তা ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘মিম সংস্কৃতি’ নিজেই এক ধরনের বিনোদন শিল্পে পরিণত হয়েছে। এখানে বাস্তব রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে ‘ভাইরাল কন্টেন্ট’ বানানো বেশি গুরুত্ব পায়। এনসিপির কোনো বক্তব্য বা ছোটখাটো ভুল মুহূর্তেই কেটে, এডিট করে, হাস্যরসাত্মক ক্যাপশন দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশে রাজনীতি এক জটিল দাবার খেলা; এখানে শত্রু-মিত্রের সম্পর্ক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এনসিপি এখন সেই অপ্রত্যাশিত খেলোয়াড়, যাকে কেউ একেবারে অবহেলা করতে পারে না, আবার কেউ সহ্যও করতে পারে না। জন্মের পর থেকেই তারা রাজনৈতিক মাঠে ঝড় তুলে দিয়েছে। আর সেই ঝড় থামানোর জন্য একযোগে নেমেছে নানা পক্ষ-প্রভাবশালী মিডিয়ার অংশবিশেষ, সোশ্যাল মিডিয়ার সাইবার সেনা, বিএনপির ভেতরের একদল ‘উদ্বিগ্ন’ নেতা, এমনকি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা।

তবে এসব শত্রুর মাঝেও এনসিপির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিত্র আছে। প্রথমত, তাদের তরুণ সমর্থকগোষ্ঠী, যারা দেশ পরিবর্তনের স্বপ্নে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ের সেই সব কর্মী যারা বছরের পর বছর তৃণমূলে আস্থা তৈরি করেছেন। তৃতীয়ত, কিছু স্বাধীনমনা সাংবাদিক ও সামাজিক কর্মী, যারা শত্রুর দলে না গিয়েও সমালোচনার স্বাধীনতা বজায় রাখছেন। যে রিকশাচালক নিজের জীবিকার চিন্তা বাদ দিয়ে শহীদের লাশ নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছিলেন, তিনি হতে পারেন এনসিপির বড় মিত্র। এনসিপির বড় মিত্র সেসব অভিভাবক যারা গণ-আন্দোলনের সময় খাবার বিতরণ করেছেন, সেই গার্মেন্টস শ্রমিক যে জীবনবাজি রেখে বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেট আর বারুদের সামনে, সেই স্কুলে পড়া কিশোর; যে স্কুল ফাঁকি দিয়ে চলে এসেছিল মিছিলে। এনসিপির বড় মিত্র হাত হারানো, পা হারানো এক যুবক; যে এখনো অভ্যুত্থানের পক্ষে কথা বলে। এনসিপির বড় মিত্র চোখ হারানো শত শত তরুণ যারা আর কখনো নতুন বাংলাদেশের দৃশ্য নিজ চোখে দেখবে না, কিন্তু তারা অনুভব করতে চায় নতুন বাংলাদেশের স্পর্শ। এনসিপির বড় মিত্র একজন চা দোকানদার, একজন কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন কর্মজীবী নারী-যারা স্বপ্ন দেখেন বৈষম্যহীন বাংলাদেশের।

এখন প্রশ্ন হলো এই শত্রুতার বলয় এনসিপি কীভাবে মোকাবিলা করবে? রাজনৈতিক শত্রু মোকাবিলা করতে হলে প্রথমেই সংগঠনের অভ্যন্তরে ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং কার্যকর নেতৃত্ব আরো শক্তিশালী করতে হবে। কোনো অপশক্তি যেন আদর্শিক লড়াইয়ে ফাটল ধরাতে না পারে। এনসিপিকে তাই প্রথম ধাপে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোকে আরো মজবুত করতে হবে। রাজনৈতিক কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে পঠন-পাঠন বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক শত্রুরা সাধারণত দুর্বলতা খোঁজে এবং সেই দুর্বলতাকে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে। এনসিপিকে তাই মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রেখে ভুল তথ্য বা অপপ্রচার দ্রুত মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য এনসিপির মিডিয়া টিমকে আরো সক্রিয় হতে হবে। ফেসবুকে এনসিপি মিডিয়া সেল নামে অন্তত ২০টি পেজ আমার চোখে পড়েছে। কোনটি প্রকৃত সেটি শনাক্ত করা জরুরি।

এনসিপি সারা দেশে অন্তত ১০ হাজার সাইবার যোদ্ধার একটি টিম গড়ে তুলতে পারে, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভুল তথ্যগুলোর ফরেনসিক কিংবা পোস্ট-মর্টেম করবেন। দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবেন প্রকৃত তথ্য। এভাবে শত্রু-শিবিরের দুর্গে আঘাত হানার কাজটি করে যেতে হবে নিরন্তর।

শুধু প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা নয়, বরং জনগণের আস্থা ও সমর্থন অর্জনই হবে এনসিপির টিকে থাকার মূল শর্ত। এ জন্য দলকে জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধানের রূপরেখা দিতে হবে। তরুণ প্রজন্ম, শ্রমজীবী, কৃষক এবং নারীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে। মাঠপর্যায়ে মানবিক কার্যক্রম, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং সরাসরি জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড এনসিপিকে ধীরে ধীরে একটি ‘জনগণের দল’-এ রূপান্তরিত করবে। এনসিপি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে পারে বিশেষ করে বই পড়া কর্মসূচি, রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প প্রভৃতির মাধ্যমে। ধরা যাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’ শিরোনামে একটি রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে। সেরা রচনাকারীরা পাবেন পুরস্কার। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এনসিপি সরাসরি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারবে। এনসিপির পরিচয় শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনও বটে। সারা বাংলাদেশের সক্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে এনসিপি একটি সাংস্কৃতিক উইং খুলতে পারে। যাদের কাজ হবে রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কাজটি এগিয়ে নেওয়া। এভাবে দলটি শত্রুর জায়গায় মিত্র তৈরি করতে পারে। 

এনসিপিকে বিকেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রতি মনোযোগী হতে হবে। অজপাড়াগাঁয়ের এক চা-দোকানিও যেন এনসিপির প্রতি ভুল ধারণা নিয়ে বসে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাৎক্ষণিক আবেগ বা প্রতিক্রিয়ার বদলে ধাপে ধাপে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। একদিকে সংগঠন শক্তিশালী করা, অন্যদিকে আদর্শ ও নীতিকে সুদৃঢ় রাখা-এই দ্বিমুখী পথই এনসিপিকে রাজনৈতিক শত্রু মোকাবিলার পথ দৃঢ় করবে। 

এনসিপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জন-আস্থা ধরে রাখা। কারণ মিডিয়ার চটকদার শিরোনাম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব আর ফ্যাসিবাদী কাঠামোর গোপন তৎপরতার মাঝে এনসিপিকে জ্বালিয়ে রাখতে হবে সত্যের মশাল। এভাবেই এনসিপি হয়ে উঠতে পারে গণমানুষের দল।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ফেয়ার দিয়া ১১/৮/ই, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট (লেভেল-৮), বক্স কালভার্ট রোড, পান্থপথ, ঢাকা ১২০৫